Dr. Haradon Debnath

আমাদের মস্তিষ্ক এবং স্পাইনাল কর্ডের চারদিকে যে সূক্ষ্ম টিস্যুর স্তরের আবরণ রয়েছে, তাকে মেনিনজেস বলে। এই টিস্যু স্তরের আবরণে সংক্রমণের ফলে যে প্রদাহ সৃষ্টি হয় তাকেই মেনিনজাইটিস বলে।

মেনিনজাইটিস সাধারণত অণুজীবের সংক্রমণের কারণে হয়ে থাকে। এছাড়া আরও অন্যান্য কারনেও মেনিনজাইটিস হতে পারে, যেমন-

ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস: নিসেরিয়া মেনিনজাইটিস বা স্ট্রেপ্টোকক্কাস নিউমোনি ব্যাকটেরিয়ার আক্রমণ এবং ঘনিষ্ঠ সংস্পর্শের মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

ভাইরাল মেনিনজাইটিস: ভাইরাসের কারণে হয় যা হাঁচি, কাশি এবং অস্বাস্থ্যকর স্বাস্থ্যবিধির মাধ্যমে ছড়িয়ে পড়ে।

প্যারাসাইট মেনিনজাইটিস: প্রাথমিক অ্যামিওবিক মেনিঙ্গএনসেফালাইটিস (পিএএম) প্যারাসাইট মেনিনজাইটিসের একটি খুব বিরল রূপ যা মস্তিষ্কে প্রাণঘাতী সংক্রমণ সৃষ্টি করে।

ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস: ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস বিরল এবং মেনিনজেসে রক্ত দ্বারা বাহিত হয়। যে কোনও মানুষ ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিসে আক্রান্ত হতে পারেন, তবে এইডস্, ডায়াবেটিস বা ক্যানসারে আক্রান্ত রোগী যাঁদের রোগ প্রতিরোধ ক্ষমতা দুর্বল তাঁদের এই রোগ হওয়ার বেশি ঝুঁকি থাকে।
অসংক্রামক মেনিনজাইটিস: একজন মানুষের থেকে অন্য জনের মধ্যে সংক্রমণ ছড়িয়ে পড়ে না, তবে অসংক্রামক মেনিনজাইটিস হওয়ার কারণ হল,
১. ক্যানসার।
২. সিস্টেমেটিক লুপাস এরিথিমেটোসাস (লুপাস)।
৩. কিছু নির্দিষ্ট ওষুধ।
৪. মাথায় আঘাত।
৫.মস্তিষ্কে অস্ত্রোপচার।

প্রাথমিক লক্ষণ থেকে মেনিনজাইটিস শনাক্ত করা কষ্টকর। আর শনাক্ত করা গেলেও প্রায় ১০ শতাংশ ক্ষেত্রে রোগী ২৪ থেকে ৪৮ ঘণ্টার মাঝে মৃত্যুবরণ করে আর ২০ শতাংশ রোগী বেঁচে গেলেও প্রতিবন্ধিতা বরণ করে নিতে হয়। ৫ বছরের নিচে শিশুরা আর ১৫-১৯ বছরের কিশোর-কিশোরীদের মাঝে এই রোগে আক্রান্ত হওয়ার প্রবণতা বেশি। তবে সব ক্ষেত্রে এ রকম হয় এমনটি বলা যাবে না।

মেনিনজাইটিসের প্রধান লক্ষণগুলো হল-
তীব্র মাথা ব্যথা, গলার মাংস শক্ত হয়ে যাওয়া, স্মৃতি বিভ্রম, বমি, বমি বমি ভাব, আলোর দিকে তাকাতে না পারা, অস্বস্তি, শরীরে বিশেষ দাগ, মূর্ছা যাওয়া, প্রচণ্ড ঘুম পাওয়া, শরীরে ভারসাম্য হারানো প্রভৃতি।
তবে বয়সভেদে এই উপসর্গগুলোর কিছুটা ভিন্নতা দেখা যেতে পারে।

মেনিনজাইটিস রোগ নির্ণয় করার জন্য যে সকল পরীক্ষা-নিরীক্ষা করা হয় তা হল-

১. রক্ত পরীক্ষা: রক্তে কোনও ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাসের উপস্থিতি আছে কিনা, তা দেখা হয়।

২. লাম্বার পাংচার: মস্তিষ্কসুষুম্না তরল (সেরিব্রোস্পাইনাল ফ্লুইড) সংগ্রহ করে পরীক্ষা করা হয় সেখানে কোনও ব্যাকটেরিয়া বা ভাইরাস রয়েছে কিনা।

৩. সিটি স্ক্যান: মস্তিষ্কে কোনও সমস্যা আছে কিনা দেখার জন্য সিটি স্ক্যান করা হয়।

মেনিনজাইটিস একটি প্রাণঘাতী রোগ এবং সঠিক সময়ে এর চিকিৎসা না হলে মৃত্যুও হতে পারে। তাই লক্ষণ প্রকাশের সাথে সাথেই একজন নিউরোলজিস্ট চিকিৎসকের পরামর্শ গ্রহন করা উচিত।

মেনিনজাইটিসের সঠিক কারন নির্ণয় করে এর চিকিৎসায় নিম্নোক্ত ঔষধ ব্যবহার করা হয়ে থাকে।

১. ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস: ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিসের ক্ষেত্রে সেফালোস্পরিনস এর মত অ্যান্টিবায়োটিক ভাল কাজ করে। এছাড়া, ক্লোরামফেনি কল একা বা অ্যাম্পিসিলিনের সঙ্গেও এই রোগ সারাতে সাহায্য করে।

২. ভাইরাল মেনিনজাইটিস: ভাইরাসজনিত মেনিনজাইটিস ব্যাকটিরিয়া মেনিনজাইটিসের মত প্রাণঘাতী নয়। এটিতে কেবল সহায়ক থেরাপি প্রয়োজন কারণ মেনিনজাইটিস সৃষ্টিকারী বেশিরভাগ ভাইরাসের জন্য নির্দিষ্ট চিকিৎসা উপযুক্ত নয়।

৩. ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিস: ক্রাইপ্টোকক্কাল বা কোক্সিডায়োডস মেনিনজাইটিসের মতো ফাঙ্গাল মেনিনজাইটিসের চিকিৎসায় উচ্চ মাত্রায় অ্যান্টিফাঙ্গাল দীর্ঘদিন ব্যবহার করা হয়।

মেনিনজাইটিসের ক্ষেত্রে ব্যাকটেরিয়াল মেনিনজাইটিস এমন একটি রোগ, যা চিকিৎসার জন্য ২৪ ঘণ্টারও কম সময় পাওয়া যায় তাই এর প্রতিরোধ স্বরূপ মেনিনগোকক্কাস ভ্যাকসিন গ্রুপ-এ, সি, ডাব্লিও-১৩৫ এবং ওয়াই টিকা গ্রহন করা উচিত।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *